Posts

Showing posts with the label যাত্রাপথে

বাংলার জল

ছোটবেলায় সন্ধ্যেবেলা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম। খুব মনে পড়ে, বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে একধরনের ডানাওয়ালা পিঁপড়ে আলোর চারপাশে ঘুরতো। গায়ে মাথায় বসে ভীষণ বিরক্ত করতো। আমরা সেগুলোকে বাদলপোকা বলতাম। একদিন সন্ধ্যেবেলা পোকাগুলো খুব বিরক্ত করছিলো বলে আমি ধরে ধরে হ্যারিকেনের মাথা দিয়ে তাদের আগুনে ফেলে দিচ্ছিলাম। তারা ছটফট করে তার মধ্যেই মরে যাচ্ছিলো। কয়েকটা করার পর দেখতে ভীষণ খারাপ লাগছিলো বলে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আর মারিনি। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম দীপিকারও একই প্রবলেম হয়েছে। সে বিরক্ত হয়ে পাশে একবাটি জল রেখে দিয়েছিলো, পোকাগুলো উড়ে উড়ে তাতে পড়ে আর উঠতে পারছিলো না। তারপর যা হয়। এই গল্প চলার মধ্যেই দীপিকা আমাকে বলেছিলো, তুই কি নিষ্ঠুর রে, পোকাগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে মারলি? ছোট বয়েস, তাই উত্তর দিয়েছিলাম, ওঃ আগুনে পুড়িয়ে মারলে নিষ্ঠুর, জলে ডুবিয়ে মারলে নিষ্ঠুর না? এখন মনে হয় কাউকে মারাটা নিষ্ঠুরতার পরিচয় নয়, কিভাবে মারছি সেটাই নিষ্ঠুরতার পরিচয়। তাই জন্যেই আমার মাথায় কাজ করে, রেপিস্টদের ফাঁসি দিয়ে শহীদের মতো মারার চেয়ে, দীর্ঘদিন ধরে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মারা উচ...

চাকরিওলার মৃত্যু

সময় দুটো। ট্রেন দুটো পনেরোয়। স্টেশন প্রায় এক কিলোমিটার। বেরোনোর ঠিক আগে জয়ন্তীদি ঘড়িটা দেখে আমাকে সুন্দর করে গুছিয়ে বুঝিয়ে দিলো, “তুই রাস্তায় বেরিয়ে প্রথমেই দেখে নিবি কাছাকাছি রিক্সা আছে কিনা। যদি থাকে, তাহলে তুই পাঁচ মিনিট নিশ্চিন্তে অটোর জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবি। পেয়ে গেলে তো ভালো, তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবি। না পেলে, রিক্সাটাকে ডেকে নিবি। চিন্তা নেই ট্রেন পেয়ে যাবি।” এতো গোছানো পরামর্শে আমরা অনেকেই হাসাহাসি করলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় বেরিয়ে এক মিনিটের মধ্যে দুটো অটো গেলো। ফাঁকা ছিলো না। রিক্সা দেখার কথা আমি ভুলেই গেছিলাম। হঠাৎ দেখি এক রিক্সাওলা খুব হাসিহাসি মুখ করে খুব দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে আসছে। জয়ন্তীদির দেওয়া পরামর্শ ভুলে জিজ্ঞেস করলাম, স্টেশন যাবেন? -- হ্যাঁ, বুঝতেই পেরেছি। -- কত নেবেন? -- যা হোক দেবেন। -- দশ? -- আপনার যা ইচ্ছা। -- বললাম, দুজনের কুড়ি, একজনের কেউ কেউ নানানরকম ভাড়া বলে। -- ও আপনি যা ইচ্ছা তাই দেবেন। বোঝা গেলো, সে আমাকে তার রিক্সায় চাপাতে পেরেই বর্তে গেছে। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। একটু পরেই রিক্সার স্পিড বাড়তে থাকলো দ...

এক টুকরো মহানগর

ডানলপ থেকে উবেরে চড়ে বসেছিলাম। রবীন্দ্র ভারতী বাসস্যান্ডে গাড়ি বাঁদিকে দাঁড়িতে গেলো। আমি ভাবলাম পুলিশের কেস খেয়েছে বুঝি। কিন্তু তা নয়। দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক উবেরের কাছে এগিয়ে এলেন। উবেরওলা একগাল হেসে বললো, “এদিকে এখন আপনি? বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি এই তোমাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। কোথায় যাচ্ছো এখন?” উবেরওলা বললো, “ওই সুলেখা আছে।” তারপর কি কথা হলো খেয়াল করলাম না, নিজের খেয়ালেই ছিলাম। আরো কিছুটা এসে আমি বললাম, “বাঁদিকের জানলার কাঁচটা একটু তুলে দেবেন? ঠাণ্ডা লাগছে।” -- “হাঁ হাঁ দিচ্ছি। আসলে উনি আমার মালিক। তাই কথা বলছিলাম।” -- “মালিক?” -- “হাঁ, আমার মালিক আছে।” -- “উনি গাড়ি কিনে উবের হিসেবে ভাড়া দিয়ে নিজে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” -- “হাঁ, উনি পাব্লিক টান্সপোটে যাতায়াত করেন, মেট্টো, বাস, টেন।” -- “বাব্বা।” -- “হাঁ, উনি খুব ভালো। উনি পড়ান। যাদবপুরে, রবীন্দ্র ভারতীতে, এখন আবার ডানলপে আছে। তিন জায়গায় পড়ায়।”   -- “কি পড়ান? এমন তিন জায়গায়?” -- “ওই যারা জপে আছে তাদের পড়ায়।” -- “জপে মানে?” -- “জপে মানে, ওই কলেজ শেষ করে ...

মার্ফির নিয়ম

মার্ফির নিয়মে বলে, “Anything that can go wrong, will go wrong”. রিক্সাতে ওঠার পরই রিক্সাওলা চলতে শুরু করলো। একটানা পথের বন্ধুদের সাবধান করে দিতে দিতে। “এ ভাই সাবধান, সামলে।” উল্টোদিকের এক ট্রলিওলা অনেক মাল নিয়ে ফিরছিলো, তাকে বললো, “কি? মোটা ভাড়া? মোটা ভাড়া মনে হচ্ছে?” আমার কলিগ জগবন্ধুদা রিক্সাওলাকে একটু সতর্ক করে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো, “ভাই একটু টেনে দিও। সাড়ে চারটেয় ট্রেন ধরতে হবে।” জগবন্ধুদা খুব শান্তশিষ্ট, নিরীহ মানুষ। রিক্সাওলা নিজের জ্ঞান জাহির করার একটা বিষয় পেলো। ঘুরে বলতে শুরু করলো, “হ্যাঁ রাস্তা দেখে সাবধানে যেতে হবে তো। আমরা রাস্তা দেখেই চালাই। আপনি বলেছেন আমি শুনলাম। কিন্তু সাবধানেই যাবো।” জগবন্ধুদা -- “হ্যাঁ, সাবধানেই যাবে, বলছি একটু টেনে দিও। আমি কতদূর যাবো জানো তো? আমার অনেক দূরে বাড়ি। সেই বনগাঁ লাইন।” রিক্সাওলা -- “ও বনগাঁ? সেই সেই সেই উত্তরে তো?” জগবন্ধুদা -- “হ্যাঁ উত্তরে, সেই বর্ডার লাইন। শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরতে হবে, এটা মিস করলে…” --- “সেই উত্তরে তো?” --- “হ্যাঁ, আমার যেতে তিনঘণ্টা লাগবে।” রিক্সাওলা অনেক হিসেব কষে বললো, “ত...

সবই মায়া

সকাল নটায় বেরোলাম। ট্রেন নটা ছত্রিশে। আসে চল্লিশে। তড়িঘড়ি বেরোনো। বেরোনোর সময় সাতপাঁচ না ভেবে চট করে, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং একটা চামড়ার স্যান্ডেল টেনে নিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তবুও শাড়ির সঙ্গে কিটোটা বড্ড বেমানান। বরকে বললাম অফিস যাওয়ার সময় আমাকে স্টেশনে নামিয়ে দিতে। তাই হলো। হুশ করে স্টেশন। তারপর নামমাত্র হাঁটা। সামান্য জলও পেরোতে হলো। স্টেশনে আমাকে দেখেই আমার কলিগ চেঁচিয়ে উঠে বললো, “একি? তুই আজকে শাড়ি? মরণদশা এই বৃষ্টিতে, পারিসও বটে তুই। ও তোর তো আবার বৃষ্টিই ভালো লাগে।”  সহযাত্রীরাও অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো। “হ্যাঁ গো, আমার তো বৃষ্টি খুব পছন্দ” বলেই, হেসে হেসে তার দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে কেমন একটা ফিলিং হতে থাকলো। খুব চেনা ফিলিং। আস্তে আস্তে পা টেনে তার কাছে এগিয়ে যাওয়ার সময় বোঝার চেষ্টা করলাম, কি হয়েছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। আক্ষরিক অর্থে পায়ের তলার মাটি গেলো সরে। বুঝলাম জুতো থেকে জুতোর সোল আলাদা হতে চাইছে। হাঁটতে গেলেই দেখি ডগার দিকটা আলাদা হয়ে ঝুলছে।  জলে পা ভেজাতে চটি অমন আহ্লাদে হয়ে গেলো, নাকি অনেকদিন ওটা পরিনি বলে, কিছু বুঝলাম না। আহ্লাদে চটি ন...

মহিলা কামরা ৮ : অন্য এক পথে

সকাল আটটা দশ। এ এক অন্য মহিলা কামরা। উঠেই দেখি কামরার একটা দিক পুরো ফাঁকা। ভাবলাম এই দিকের কামরা বুঝি এমনই হয়, তায় আবার এতো সকাল। গুছিয়ে জানলার ধারে বসলাম। একটা স্টেশন এলো। হুড়মুড় করে সবাই উঠেই ফাঁকা দিকে ধেয়ে এলো। অন্যদিক থেকে অন্যরা চিৎকার করে সাবধান করতে লাগলো, “ওদিকে নোংরা, যেও না যেও না।” আমার টনক নড়লো। চারদিক চনমন করে তাকিয়ে নোংরা খুঁজতে লাগলাম। ট্রেনের মেঝেতে খাবারের প্যাকেট, ঘুগনির বাটি, লেবুর খোসা এসব ছাড়া আশেপাশে কিচ্ছু দেখতে পেলাম না। এ আর কি এমন নোংরা, আমাদের এখানে ট্রেন তো এমনই হয়। স্বচ্ছ ভারত করতে হবে, স্বচ্ছ ট্রেন তো নয়! তবুও মনে হলো, আমি বুঝি নোংরাটা দেখতে পাচ্ছি না। উঠে অন্যদিকে চলেই যাই। গিয়ে দেখলাম ততক্ষণে আর কোনো সিট ফাঁকা নেই। অনেকদূর যাওয়া, তাই ফিরে এসে আগের জায়গাতেই বসলাম। প্রতিটা স্টেশন আসে, লোকজন ফাঁকা দিকে ধেয়ে আসে, সবাই সাবধান করতে থাকায় আবার ফিরে গিয়ে ওই দিকেই ভিড় করে। আমি একা অমন সাহস করে বসে থাকায় লোকে আমাকে হয়তো পাগলই ভাবছিলো। কিচ্ছুক্ষণ পর কেউ আর অন্যদের পাত্তা না দিয়ে আমাকে দেখে ভরসা পেয়ে বসতে এলো। আমার সিট, আমার উল্টোদিকের সিট...

মহিলা কামরা ৭

মুকুটের পালক রাজকুমারদা পেয়ারা নিয়ে এসে চুপ থাকতে পারে না। সব দিদিমণিদের মনে করিয়ে দেয় সে হাজির। এক দিদিমণিকে বারবার জিজ্ঞেস করতে থাকলো, দিদিমণি আজ পেয়ারা দেবো না? দিদিমণি বাধ্য হয়ে তাঁর প্রবলেম বলতে শুরু করলেন, “আরে নিতেই তো পারি। মুশকিল কি জানো, আমি খেতে ভুলে যাই। ব্যাগে পড়ে থেকে পেকেপুকে একাকার হয়ে যায়, যখন ব্যাগ থেকে পেয়ারা বেরোয় তখন দেখি পচা গন্ধ হয়ে গেছে। এক যদি টিফিন খাওয়ার পরে পরেই খাই তাহলে হয়, যদি পরে খাবো বলে রেখে দি তাহলেই গ্যালো। ঠিক আছে তাও দাও ডাঁসা দেখে একটা।” রাজকুমার ডাঁসা দেখে একটা দিয়ে দিলো। দিদিমণির পাশে আর এক দিদিমণি বসে ছিলেন। উনি বলতে লাগলেন, “তুমি ডাঁসা পছন্দ করো? আমার মেয়েও তাই।” -- “আমার মেয়েরা আবার ডাঁসা একদম পছন্দ করে না, একটু পাকা পাকা হলে তাদের খুব ভালো। বড় মেয়ে তো আবার মাঝখান থেকে বীজগুলো খেয়ে খোলাটা ফেলে রাখে।” -- “আমার মেয়ের বাব্বা! একচুল এদিক ওদিক হওয়া চলবে না। না পাকা, না খুব কাঁচা। ওই একেবারে ডাঁসা যাকে বলে সেটাই চাই।” -- “তোমার মেয়ে এখন কি করে যেন?” -- “সে তো মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেছে।” -- “ও তাই? সেটা জানতাম না তো!” -- “হ্যাঁ,...