Posts

Showing posts with the label বাংলা

এক টুকরো মহানগর

ডানলপ থেকে উবেরে চড়ে বসেছিলাম। রবীন্দ্র ভারতী বাসস্যান্ডে গাড়ি বাঁদিকে দাঁড়িতে গেলো। আমি ভাবলাম পুলিশের কেস খেয়েছে বুঝি। কিন্তু তা নয়। দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক উবেরের কাছে এগিয়ে এলেন। উবেরওলা একগাল হেসে বললো, “এদিকে এখন আপনি? বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি এই তোমাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। কোথায় যাচ্ছো এখন?” উবেরওলা বললো, “ওই সুলেখা আছে।” তারপর কি কথা হলো খেয়াল করলাম না, নিজের খেয়ালেই ছিলাম। আরো কিছুটা এসে আমি বললাম, “বাঁদিকের জানলার কাঁচটা একটু তুলে দেবেন? ঠাণ্ডা লাগছে।” -- “হাঁ হাঁ দিচ্ছি। আসলে উনি আমার মালিক। তাই কথা বলছিলাম।” -- “মালিক?” -- “হাঁ, আমার মালিক আছে।” -- “উনি গাড়ি কিনে উবের হিসেবে ভাড়া দিয়ে নিজে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” -- “হাঁ, উনি পাব্লিক টান্সপোটে যাতায়াত করেন, মেট্টো, বাস, টেন।” -- “বাব্বা।” -- “হাঁ, উনি খুব ভালো। উনি পড়ান। যাদবপুরে, রবীন্দ্র ভারতীতে, এখন আবার ডানলপে আছে। তিন জায়গায় পড়ায়।”   -- “কি পড়ান? এমন তিন জায়গায়?” -- “ওই যারা জপে আছে তাদের পড়ায়।” -- “জপে মানে?” -- “জপে মানে, ওই কলেজ শেষ করে ...

কড়ুই

Image
শীতের ঠিক আগে আগে মুর্শিদাবাদ থেকে মিস্ত্রী আনা হতো কড়ুই তৈরি করার জন্য। তারা এসে অনেকদিন থাকতো, খেতো, আর কড়ুই বুনতো। এই কাজটা সবাই পারে না। একটা কড়ুই বুনতে অনেকদিন সময় লাগতো। আমি ছোটবেলায় দুটো কড়ুই বোনা দেখেছি। মড়াই বোনাও দেখেছি একবার। মড়াইটা খড় পাকিয়ে বিচালি তৈরি করে বুনতে হতো, আর কড়ুইটা বাঁশের বাতা দিয়ে। মড়াই নিয়মমতো ছোট-বড় করা যেতো। কড়ুই একবার তৈরি হয়ে গেলে ফিক্সড। ষাট মণ, আশি মণ, নানা মাপের কড়ুই হতো।   প্রথমে মাটিতে বাতা পুঁতে পুঁতে গোল করে পানের ডাবরের মতো একটা ফ্রেম বানানো হতো। তারপর তারমধ্যে আরো সরু সরু বাতা দিয়ে দিয়ে সুন্দর ডিজাইন করে কড়ুই বোনা হতো। ঝুরি, চুপড়ি, ধামা বানানোর মতোই একটা পদ্ধতি। কড়ুইয়ের ফ্রেম এতো বড় তাই দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাওয়া যেতো না। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি হলে, দড়ি দিয়ে বেঁধে পাঁচিল টপকে অনেক কষ্ট করে ভিতরে নিয়ে যেতে হতো। অনেক লোকও লাগতো তার জন্যে। এইসব কঠিন কঠিন কাজ করার সময় তারা মুখে নানা আওয়াজ করতো। গান করতো। ছড়ার মতো করেও অনেক লাইন বলতো। সেগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগতো। কিন্তু উচ্চারণ বুঝতে পারতাম না...

দুঃস্বপ্ন

ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার সময় ফকির পাড়া দিয়ে ফিরতাম। খুব জল তেষ্টা পেলে নৌসেরদাদের বাড়িতে গিয়ে বলতাম - বৌদি জল দাও। বৌদি জলের সঙ্গে বাতাসাও দিতো। সেই বাতাসাগুলো ওদের মসজিদের মানত মেটানোর বাতাসা। মানতটা হিন্দু-মুসলিম সবাই করতে পারে। মসজিদটাকে বলাও হয় শাহ-কামালের মন্দির। নৌসেরদার দিদিকে আমরা আশলে-দি বলি। সে আমাদের বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই বেড়াতে আসতো। তখনকার দিনে গ্রামের যারা হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে যেতো না, বাড়িতে বাচ্চা প্রসব করানোর কাজটা আশলেদিই করতো। আশলেদির এক বৌমার মেয়ে নেই। সেই বৌমা আমাকে বলতো - তুই আমার মেয়ে। আমাকে মা বলে ডাকবি। মেয়ে বলে তাদের প্রতিটা পরবের সিমাই আর নানান খাবার আমার জন্যে রেখে দিতো। আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে খেয়ে আসতাম। স্কুলে আমার প্রিয় বন্ধু ছিলো হাসিবা। কতবার তাদের বাড়ি যেতাম হিসেব দিতে পারবো না। বিশেষ করে পেয়ারার দিনগুলোতে। তাদের বাড়ির উঠোন জুড়ে পেয়ারা গাছ। কোন গাছের পেয়ারা কেমন সেটা আমি দীপিকা, দোলা, রিক্তাদি সবাই জানতাম। তাদের কলকাতায় বেকারি বিস্কুটের কারখানা ছিলো। কলকাতা থেকে আনা অনেক জিনিসও খেতে পেতাম হাসিবার থেকে। সাকিনা, হাসিনা, আকতারাও যেতে ...

বাঙালি

আগ্রা, অনেক বছর আগে “তুম কেয়া বাংলা পড়নে জানতে হো?”   “বলনে ভি জানতা হুঁ।”   “আচ্ছা! কাঁহা শিখা?”   “কলকাত্তা। আপনি হিন্দি চালিয়ে যেতে পারেন, বেশ লাগছে।”   “দূর মশাই! আমি গড়পারের লোক, হিন্দি কি কেউ সাধে বলে নাকি?” কলকাতায় সবাই বাংলা বলি। কেউ কারো সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলি না। কিন্তু বাংলার বাইরে গেলে বাংলা ভাষার কদর অনেকটা বেড়ে যায়। এক বাঙালি অন্য বাঙালিকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। ১। রোম, ২০০৫ “আপনারে কেমন সেনা সেনা লাগসে।” হকচকিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “না, আমি তো আপনাকে চিনি না।” “না, আমার কেমন সেনা সেনা লাগসে। আমি আপনারে কোথায় য্যানো দেখসি।” “না, কোথাও দেখেননি। আপনার কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।” “না, আপনারে দেখসি।” খুব সিরিয়াস হয়ে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম -- “শুনুন আসলে আপনার গায়ের রঙ, আমার গায়ের রঙের সঙ্গে কোনো তফাৎ নেই তো, তাই আপনার মনে হচ্ছে আপনি আমাকে কোথাও দেখেছেন। বিদেশ বিভূঁইতে একটু একইরকম দেখতে লোক মনে হলে আপনার এমন চেনা চেনা লাগতে পারে, কিন্তু আমি আপনার চেনা নই।” সুদূর রোমে। আমি একা একটা জায়গায় লাগেজটা নিয়ে দাঁড়িয়ে। বর গে...

বাংলায় বাংলা

সন্তোষপুর মোড় থেকে আমার কলেজ প্রায় এক কিলোমিটার। সেটুকু রাস্তা অটো বা রিক্সায় যেতে হয়। একদিন হঠাৎ অটোতে উঠে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। “Where will you get down madam?” আমি বাংলায় বললাম, “কলেজে নামবো।” “OK, I thought so.” আমি হেসেছিলাম। নামার সময় যখন ভাড়া দিতে গিয়েছিলাম, তখন অটোওয়ালা জিজ্ঞেস করেছিলো, “Don’t you have change?” আমি বলেছিলাম, “না।” অটোওয়ালা বলেছিলো, “It’s OK, nobody seems to have change. I’ll give you change. ” অবাক হবার কিছু নেই। আমার অন্য কলিগরাও ওর অটোতে উঠেছে। আমাদের দেখলেই সে ইংরাজী বলে। আরো একদিনের ঘটনা। একদিন কলেজ যাওয়ার সময় সন্তোষপুর মোড়ে গিয়েই শুনলাম অটোস্ট্রাইক, একটা অটোও যাবে না। কোনো রিক্সাও যেতে চাইলো না, বা সুযোগ বুঝে ভাড়া তিনগুণ চাইতে লাগলো। কয়েক মিনিট পরে শুনতে পেলাম, “ম্যাডাম যাবেন? দশ টাকা দিতে হবে কিন্তু।” পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি এক রিক্সাওলা আমাকে কথাটা বলছে। অলরেডি তার রিক্সায় এক মহিলা বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। শেয়ারে যেতে হবে তিনি দশ আমি দশ। পনেরো টাকা ভাড়া হয় দুজনে, রিক্সাওলার কুড়ি হলো, সেও খুশি আমিও খুশি। তবে সেই মহিল...