Posts

Showing posts with the label অভিজ্ঞতা

বাংলার জল

ছোটবেলায় সন্ধ্যেবেলা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম। খুব মনে পড়ে, বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে একধরনের ডানাওয়ালা পিঁপড়ে আলোর চারপাশে ঘুরতো। গায়ে মাথায় বসে ভীষণ বিরক্ত করতো। আমরা সেগুলোকে বাদলপোকা বলতাম। একদিন সন্ধ্যেবেলা পোকাগুলো খুব বিরক্ত করছিলো বলে আমি ধরে ধরে হ্যারিকেনের মাথা দিয়ে তাদের আগুনে ফেলে দিচ্ছিলাম। তারা ছটফট করে তার মধ্যেই মরে যাচ্ছিলো। কয়েকটা করার পর দেখতে ভীষণ খারাপ লাগছিলো বলে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আর মারিনি। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম দীপিকারও একই প্রবলেম হয়েছে। সে বিরক্ত হয়ে পাশে একবাটি জল রেখে দিয়েছিলো, পোকাগুলো উড়ে উড়ে তাতে পড়ে আর উঠতে পারছিলো না। তারপর যা হয়। এই গল্প চলার মধ্যেই দীপিকা আমাকে বলেছিলো, তুই কি নিষ্ঠুর রে, পোকাগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে মারলি? ছোট বয়েস, তাই উত্তর দিয়েছিলাম, ওঃ আগুনে পুড়িয়ে মারলে নিষ্ঠুর, জলে ডুবিয়ে মারলে নিষ্ঠুর না? এখন মনে হয় কাউকে মারাটা নিষ্ঠুরতার পরিচয় নয়, কিভাবে মারছি সেটাই নিষ্ঠুরতার পরিচয়। তাই জন্যেই আমার মাথায় কাজ করে, রেপিস্টদের ফাঁসি দিয়ে শহীদের মতো মারার চেয়ে, দীর্ঘদিন ধরে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মারা উচ...

শ্যাঁকামালের মেলা

“কি গো ছোটমামী, মেয়েরা মেলায় আসবে তো?” “কি জানি মা, কে কি করে। সবারই তো বাড়িতে কাজ। তোর মেয়েরা আসবে?” “হ্যাঁ, বড়টা আসবে, ছোটটা হয়তো এবার পারবে না। মেজোমামী তোমার মেয়েরা?” মেজোমামীও ওইরকমই একটা উত্তর দেয়। মেলা চলার মাঝামাঝি পর্যন্ত এই চলে। কে এসেছে, কে আসবে। এই গল্পের মামীরা হিন্দু, ভাগ্নি মুসলিম। কিন্তু মেলাটা মিলেমিশে সবার। ছোট থেকে সেই মাঘ মাসের আট তারিখের অপেক্ষায় থাকতাম। দিন গুনতাম, আর কত বাকি। আনে-বালা পল যানে-বালা হ্যায়।কিন্তু সেসব আমাদের মাথায় থাকতো না। আগে তো আসুক, তারপর যাওয়ার কথা। আমাদের গ্রামে ফকির পাড়ায় একটা মসজিদ আছে। সেটার আসল নাম হয়তো শাহ-কামালের মসজিদ। কিন্তু সবাই সেটা শ্যাঁকামালের মন্দির বলে। কেউ মসজিদ বলে না। ওটাকে ঘিরেই মেলা। প্রতি মাঘ মাসের সাত তারিখে ওই মসজিদটাকে পুরো দুধ দিয়ে ধোয়া হয়। বাজি পুড়িয়ে আনন্দ করা হয়। এটাকে বলে মাড়ো ধোওয়া। তারপর আট তারিখ থেকে মেলা শুরু হয়। পীরের গান আর যাত্রাও হয়। আগে টানা আট-নদিন যাত্রা হতো। এখন কদিন হয় জানিনা। মসজিদের মাহাত্ম্য এতোটাই যে, সবাই সুখে-দুখে বাবা শ্যাঁকামালকে মানত করে বসে। জ্বর...

চাকরিওলার মৃত্যু

সময় দুটো। ট্রেন দুটো পনেরোয়। স্টেশন প্রায় এক কিলোমিটার। বেরোনোর ঠিক আগে জয়ন্তীদি ঘড়িটা দেখে আমাকে সুন্দর করে গুছিয়ে বুঝিয়ে দিলো, “তুই রাস্তায় বেরিয়ে প্রথমেই দেখে নিবি কাছাকাছি রিক্সা আছে কিনা। যদি থাকে, তাহলে তুই পাঁচ মিনিট নিশ্চিন্তে অটোর জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবি। পেয়ে গেলে তো ভালো, তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবি। না পেলে, রিক্সাটাকে ডেকে নিবি। চিন্তা নেই ট্রেন পেয়ে যাবি।” এতো গোছানো পরামর্শে আমরা অনেকেই হাসাহাসি করলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় বেরিয়ে এক মিনিটের মধ্যে দুটো অটো গেলো। ফাঁকা ছিলো না। রিক্সা দেখার কথা আমি ভুলেই গেছিলাম। হঠাৎ দেখি এক রিক্সাওলা খুব হাসিহাসি মুখ করে খুব দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে আসছে। জয়ন্তীদির দেওয়া পরামর্শ ভুলে জিজ্ঞেস করলাম, স্টেশন যাবেন? -- হ্যাঁ, বুঝতেই পেরেছি। -- কত নেবেন? -- যা হোক দেবেন। -- দশ? -- আপনার যা ইচ্ছা। -- বললাম, দুজনের কুড়ি, একজনের কেউ কেউ নানানরকম ভাড়া বলে। -- ও আপনি যা ইচ্ছা তাই দেবেন। বোঝা গেলো, সে আমাকে তার রিক্সায় চাপাতে পেরেই বর্তে গেছে। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। একটু পরেই রিক্সার স্পিড বাড়তে থাকলো দ...

জীবনের মানে

গ্রামে গিয়ে এখন আর ঘুরে বেড়ানো হয়না। একদিনের জন্যে যাই। গিয়ে রেস্ট নিতে নিতেই ফেরার সময় এসে যায়। এবারে একটু নিজেকে মোটিভেট করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম।   এখন অনেক নতুন মুখ উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, আমিও তাদের। কোনো কোন ছেলেমেয়ে, বউকে জিজ্ঞেসও করি, “তুমি কে?” “তোমার বাবার নাম কি?” “তুমি কার বউ?” পরিচয় দিলে বুঝি। কারো বা মুখ দেখেই বুঝে যাই। আমাকেও কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে। এবারেই একজন বউ আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কে গো? তোমাকে কখনো দেখিনি তো তাই জিজ্ঞেস করছি।” নিজের পরিচয় কিভাবে দেবো বুঝে উঠতে না পেরে, এক কাকীমাকে বললাম, “কাকীমা আমি কে, একটু বলে দাও।” কাকীমা বলে দিলো, সেইসঙ্গে জানতে চাইলো আমি তাকে চিনি কিনা। বললাম, চিনি না। তখন কাকীমা তারও পরিচয়ও দিলো। কিন্তু তার একটু আগে আমি ওই বউটাকে খুব ঝগড়া করতে দেখে তার মুখের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাই সে আমার পরিচয় জানতে চেয়েছিলো। একদল বাচ্চা সরস্বতী পুজোর জন্যে বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে চাঁদা আদায় করছিলো। সেখানে বাচ্চাদের মধ্যে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। বাচ্চাদের মধ্যে ওই বউটার বাচ্চাও ছিলো। তাই সে এসে তার বাচ্চ...

এক টুকরো মহানগর

ডানলপ থেকে উবেরে চড়ে বসেছিলাম। রবীন্দ্র ভারতী বাসস্যান্ডে গাড়ি বাঁদিকে দাঁড়িতে গেলো। আমি ভাবলাম পুলিশের কেস খেয়েছে বুঝি। কিন্তু তা নয়। দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক উবেরের কাছে এগিয়ে এলেন। উবেরওলা একগাল হেসে বললো, “এদিকে এখন আপনি? বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি এই তোমাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। কোথায় যাচ্ছো এখন?” উবেরওলা বললো, “ওই সুলেখা আছে।” তারপর কি কথা হলো খেয়াল করলাম না, নিজের খেয়ালেই ছিলাম। আরো কিছুটা এসে আমি বললাম, “বাঁদিকের জানলার কাঁচটা একটু তুলে দেবেন? ঠাণ্ডা লাগছে।” -- “হাঁ হাঁ দিচ্ছি। আসলে উনি আমার মালিক। তাই কথা বলছিলাম।” -- “মালিক?” -- “হাঁ, আমার মালিক আছে।” -- “উনি গাড়ি কিনে উবের হিসেবে ভাড়া দিয়ে নিজে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” -- “হাঁ, উনি পাব্লিক টান্সপোটে যাতায়াত করেন, মেট্টো, বাস, টেন।” -- “বাব্বা।” -- “হাঁ, উনি খুব ভালো। উনি পড়ান। যাদবপুরে, রবীন্দ্র ভারতীতে, এখন আবার ডানলপে আছে। তিন জায়গায় পড়ায়।”   -- “কি পড়ান? এমন তিন জায়গায়?” -- “ওই যারা জপে আছে তাদের পড়ায়।” -- “জপে মানে?” -- “জপে মানে, ওই কলেজ শেষ করে ...

মার্ফির নিয়ম

মার্ফির নিয়মে বলে, “Anything that can go wrong, will go wrong”. রিক্সাতে ওঠার পরই রিক্সাওলা চলতে শুরু করলো। একটানা পথের বন্ধুদের সাবধান করে দিতে দিতে। “এ ভাই সাবধান, সামলে।” উল্টোদিকের এক ট্রলিওলা অনেক মাল নিয়ে ফিরছিলো, তাকে বললো, “কি? মোটা ভাড়া? মোটা ভাড়া মনে হচ্ছে?” আমার কলিগ জগবন্ধুদা রিক্সাওলাকে একটু সতর্ক করে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো, “ভাই একটু টেনে দিও। সাড়ে চারটেয় ট্রেন ধরতে হবে।” জগবন্ধুদা খুব শান্তশিষ্ট, নিরীহ মানুষ। রিক্সাওলা নিজের জ্ঞান জাহির করার একটা বিষয় পেলো। ঘুরে বলতে শুরু করলো, “হ্যাঁ রাস্তা দেখে সাবধানে যেতে হবে তো। আমরা রাস্তা দেখেই চালাই। আপনি বলেছেন আমি শুনলাম। কিন্তু সাবধানেই যাবো।” জগবন্ধুদা -- “হ্যাঁ, সাবধানেই যাবে, বলছি একটু টেনে দিও। আমি কতদূর যাবো জানো তো? আমার অনেক দূরে বাড়ি। সেই বনগাঁ লাইন।” রিক্সাওলা -- “ও বনগাঁ? সেই সেই সেই উত্তরে তো?” জগবন্ধুদা -- “হ্যাঁ উত্তরে, সেই বর্ডার লাইন। শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরতে হবে, এটা মিস করলে…” --- “সেই উত্তরে তো?” --- “হ্যাঁ, আমার যেতে তিনঘণ্টা লাগবে।” রিক্সাওলা অনেক হিসেব কষে বললো, “ত...