Posts

Showing posts with the label মানুষের কথা

শ্যাঁকামালের মেলা

“কি গো ছোটমামী, মেয়েরা মেলায় আসবে তো?” “কি জানি মা, কে কি করে। সবারই তো বাড়িতে কাজ। তোর মেয়েরা আসবে?” “হ্যাঁ, বড়টা আসবে, ছোটটা হয়তো এবার পারবে না। মেজোমামী তোমার মেয়েরা?” মেজোমামীও ওইরকমই একটা উত্তর দেয়। মেলা চলার মাঝামাঝি পর্যন্ত এই চলে। কে এসেছে, কে আসবে। এই গল্পের মামীরা হিন্দু, ভাগ্নি মুসলিম। কিন্তু মেলাটা মিলেমিশে সবার। ছোট থেকে সেই মাঘ মাসের আট তারিখের অপেক্ষায় থাকতাম। দিন গুনতাম, আর কত বাকি। আনে-বালা পল যানে-বালা হ্যায়।কিন্তু সেসব আমাদের মাথায় থাকতো না। আগে তো আসুক, তারপর যাওয়ার কথা। আমাদের গ্রামে ফকির পাড়ায় একটা মসজিদ আছে। সেটার আসল নাম হয়তো শাহ-কামালের মসজিদ। কিন্তু সবাই সেটা শ্যাঁকামালের মন্দির বলে। কেউ মসজিদ বলে না। ওটাকে ঘিরেই মেলা। প্রতি মাঘ মাসের সাত তারিখে ওই মসজিদটাকে পুরো দুধ দিয়ে ধোয়া হয়। বাজি পুড়িয়ে আনন্দ করা হয়। এটাকে বলে মাড়ো ধোওয়া। তারপর আট তারিখ থেকে মেলা শুরু হয়। পীরের গান আর যাত্রাও হয়। আগে টানা আট-নদিন যাত্রা হতো। এখন কদিন হয় জানিনা। মসজিদের মাহাত্ম্য এতোটাই যে, সবাই সুখে-দুখে বাবা শ্যাঁকামালকে মানত করে বসে। জ্বর...

জীবনের মানে

গ্রামে গিয়ে এখন আর ঘুরে বেড়ানো হয়না। একদিনের জন্যে যাই। গিয়ে রেস্ট নিতে নিতেই ফেরার সময় এসে যায়। এবারে একটু নিজেকে মোটিভেট করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম।   এখন অনেক নতুন মুখ উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, আমিও তাদের। কোনো কোন ছেলেমেয়ে, বউকে জিজ্ঞেসও করি, “তুমি কে?” “তোমার বাবার নাম কি?” “তুমি কার বউ?” পরিচয় দিলে বুঝি। কারো বা মুখ দেখেই বুঝে যাই। আমাকেও কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে। এবারেই একজন বউ আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কে গো? তোমাকে কখনো দেখিনি তো তাই জিজ্ঞেস করছি।” নিজের পরিচয় কিভাবে দেবো বুঝে উঠতে না পেরে, এক কাকীমাকে বললাম, “কাকীমা আমি কে, একটু বলে দাও।” কাকীমা বলে দিলো, সেইসঙ্গে জানতে চাইলো আমি তাকে চিনি কিনা। বললাম, চিনি না। তখন কাকীমা তারও পরিচয়ও দিলো। কিন্তু তার একটু আগে আমি ওই বউটাকে খুব ঝগড়া করতে দেখে তার মুখের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাই সে আমার পরিচয় জানতে চেয়েছিলো। একদল বাচ্চা সরস্বতী পুজোর জন্যে বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে চাঁদা আদায় করছিলো। সেখানে বাচ্চাদের মধ্যে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। বাচ্চাদের মধ্যে ওই বউটার বাচ্চাও ছিলো। তাই সে এসে তার বাচ্চ...

এক টুকরো মহানগর

ডানলপ থেকে উবেরে চড়ে বসেছিলাম। রবীন্দ্র ভারতী বাসস্যান্ডে গাড়ি বাঁদিকে দাঁড়িতে গেলো। আমি ভাবলাম পুলিশের কেস খেয়েছে বুঝি। কিন্তু তা নয়। দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক উবেরের কাছে এগিয়ে এলেন। উবেরওলা একগাল হেসে বললো, “এদিকে এখন আপনি? বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি এই তোমাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। কোথায় যাচ্ছো এখন?” উবেরওলা বললো, “ওই সুলেখা আছে।” তারপর কি কথা হলো খেয়াল করলাম না, নিজের খেয়ালেই ছিলাম। আরো কিছুটা এসে আমি বললাম, “বাঁদিকের জানলার কাঁচটা একটু তুলে দেবেন? ঠাণ্ডা লাগছে।” -- “হাঁ হাঁ দিচ্ছি। আসলে উনি আমার মালিক। তাই কথা বলছিলাম।” -- “মালিক?” -- “হাঁ, আমার মালিক আছে।” -- “উনি গাড়ি কিনে উবের হিসেবে ভাড়া দিয়ে নিজে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে?” -- “হাঁ, উনি পাব্লিক টান্সপোটে যাতায়াত করেন, মেট্টো, বাস, টেন।” -- “বাব্বা।” -- “হাঁ, উনি খুব ভালো। উনি পড়ান। যাদবপুরে, রবীন্দ্র ভারতীতে, এখন আবার ডানলপে আছে। তিন জায়গায় পড়ায়।”   -- “কি পড়ান? এমন তিন জায়গায়?” -- “ওই যারা জপে আছে তাদের পড়ায়।” -- “জপে মানে?” -- “জপে মানে, ওই কলেজ শেষ করে ...

কাঠবিড়ালী

বৃষ্টিভেজা দিন। অলস মন। হাবিজাবি জিনিস মাথায় ভিড় করছে। তার মধ্যেই হঠাৎ মনে এলো, ‘ফজলো গয়লা’ কথাটা। এটা একটা নাম। হ্যাঁ, আমার বড়জেঠুর ডাকনাম ফজলো, আমরা জাতিতে গয়লা। লোকে ফজলো গয়লার ভাইঝি বললে খুব রাগ হতো, লজ্জাও পেতাম। পরে নামটা ভেবে মনে মনে হাসতাম। যদিও শোনা যায়, কৃষ্ণ গয়লার বাড়িতে জন্মেছে, তবুও আমার দিদিশাশুড়ির গয়লায় মেয়েতে একটু আপত্তি ছিলো। জাত জিজ্ঞেস করাতে আমার অধার্মিক বর যখন সেটা বলার প্রয়োজনই মনে করেনি, তখন তিনি হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন -- হ্যাঁ রে তবে কি গয়লা?? যাকগে সেসব অন্য প্রসঙ্গ। সে আর একদিন হবে খন। বড়জেঠুর নাম গণেশ, মেজোজেঠুর নাম কার্তিক। তখনকার দিনে শ্বশুর, ভাসুর, বরের নাম ধরে ডাকতে নেই বলে কত ভালো ভালো নামই এমন বেঘোরে বাজে নামে পরিণত হয়ে গেছে। এইভাবেই গণেশ চন্দ্র ঘোষ - ফজলো গয়লা হয়ে গেছিলো।   আমার মা’ও ঠাকুমাদের পথ অনুসরণ করে বড়দের নাম না বলা অভ্যেস করেছিলো। খুব দরকারি কাজে, হয়তো আদমশুমারিতে বাড়ির সবার নাম বলতে হবে, বা পুজোর সময় নামগোত্র বলতে হবে, তখনো আকার ইঙ্গিতেই বুঝিয়ে দিতো। বড়জেঠুকে বোঝাতে গিয়ে বলতো পেট বড় বা পেটনাদা ...

গেস্ট হাউস

Image
তিনদিন ত্রিপুরা ইউনিভার্সিটির গেস্ট হাউসে ছিলাম। সকালবেলা দুজন মাসি ঘর পরিষ্কার করে মুছে দিতো। মাসিরা ঘর ঝাঁট দিতে দিতে রুহানকে দেখে বললো, “ছেলে বাচ্চা আছে না ম্যাডাম?” প্রথমে বুঝতে না পেরে বললাম, “কি?” মাসি আবার বললো, “ছেলে বাচ্চা?” বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ ছেলে।” মাসি বললো, “ও বাংলা বোঝে?” বললাম, “হ্যাঁ বোঝে বলতে পারে, পড়তে, লিখতে সব পারে।” -- “আপনিও তো বাংলা বলতে পারেন ম্যাডাম। এখানে অনেক ম্যাডাম আসেন কিন্তু বেশিরভাগই বাংলা বলতে পারে না। আমাদের খুব কষ্ট হয়। কেউ বাংলা বলতে পারলে আমরা কথা বলতে পারি। কথা বললে একটু ভালো লাগে।” -- “আপনারা তো কলকাতা থেকে এসেছেন ম্যাডাম? আপনাদের দেখলেই বোঝা যায়। আমরা গ্রামে থাকি ম্যাডাম, আমাদের কথা কলকাতার মতো বালো বাংলা না, শুদ্ধ বাংলা না। আপনি আমাদের কথা বুঝতে পারছেন?” -- “হ্যাঁ পারছি।” -- “আমাদের অনেক কষ্ট ম্যাডাম। আমরা সকালবেলা বাড়ি থেকে দৌড়তে আসি, অনেক কাজ করি এখানে তেমন মাইনে পাই না।” -- “কতদূর থেকে আসো?” -- “আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে।” -- “হেঁটে আসো কেন? অটো, টোটো বা বাস নেই?” -- “থাকবে না কেন ম্যাডাম? আমরা গাড়িতে খর...

কড়ুই

Image
শীতের ঠিক আগে আগে মুর্শিদাবাদ থেকে মিস্ত্রী আনা হতো কড়ুই তৈরি করার জন্য। তারা এসে অনেকদিন থাকতো, খেতো, আর কড়ুই বুনতো। এই কাজটা সবাই পারে না। একটা কড়ুই বুনতে অনেকদিন সময় লাগতো। আমি ছোটবেলায় দুটো কড়ুই বোনা দেখেছি। মড়াই বোনাও দেখেছি একবার। মড়াইটা খড় পাকিয়ে বিচালি তৈরি করে বুনতে হতো, আর কড়ুইটা বাঁশের বাতা দিয়ে। মড়াই নিয়মমতো ছোট-বড় করা যেতো। কড়ুই একবার তৈরি হয়ে গেলে ফিক্সড। ষাট মণ, আশি মণ, নানা মাপের কড়ুই হতো।   প্রথমে মাটিতে বাতা পুঁতে পুঁতে গোল করে পানের ডাবরের মতো একটা ফ্রেম বানানো হতো। তারপর তারমধ্যে আরো সরু সরু বাতা দিয়ে দিয়ে সুন্দর ডিজাইন করে কড়ুই বোনা হতো। ঝুরি, চুপড়ি, ধামা বানানোর মতোই একটা পদ্ধতি। কড়ুইয়ের ফ্রেম এতো বড় তাই দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাওয়া যেতো না। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি হলে, দড়ি দিয়ে বেঁধে পাঁচিল টপকে অনেক কষ্ট করে ভিতরে নিয়ে যেতে হতো। অনেক লোকও লাগতো তার জন্যে। এইসব কঠিন কঠিন কাজ করার সময় তারা মুখে নানা আওয়াজ করতো। গান করতো। ছড়ার মতো করেও অনেক লাইন বলতো। সেগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগতো। কিন্তু উচ্চারণ বুঝতে পারতাম না...