Posts

বেস্ট ফ্রেন্ড

-- মা, তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড কে? -- উমম! তুমি। -- সেকেন্ড বেস্ট? -- এইরে! ভাবতে হবে! -- কেন? আমি আর বাবা ছাড়া অন্য কে? সেটা বলো। -- আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই…   -- সেকি? ভাবতে হবে? আমি এটা বিশ্বাসই করতে পারছি না। -- কেন? -- কেন? আবার জিজ্ঞেস করছো? তোমার মা তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড নয়? আমার তো তুমি বেস্ট ফ্রেন্ড। -- হুম! আসলে কি জানতো, আমি তো অনেকদিন হলো, আমার মায়ের কাছে নেই, আর মা আমার থেকে অনেক দূরে থাকে, তাই ঠিক সব কথা বলা হয়ে ওঠে না, আর দিদুনকে এখন সব কথা বলাও যায় না… মাঝখানে হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে, ‘তো কি হয়েছে? তোমার মা তোমার থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকে, তাতে প্রবলেমটা কি? ঋতীষাও তো আমার থেকে দূরে থাকে। আমিও কি রোজ তার কাছে থাকি? তবুও তো সে আমার একজন বেস্ট ফ্রেন্ড।’’ হ্যাঁ, আমার আর রুহানেরই কথোপকথন। তার মনে অনেক কৌতূহল অনেক জিজ্ঞাসা। মাঝে মাঝে উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যেতে হয়। দুজনের খুনসুটির মধ্যেই, প্রতিদিনের মতো মা'কে ফোন করলাম। কেমন আছো? জিজ্ঞেস করার পর, ‘'না, না একদম ভালো নেই!” কথাটা এমনভাবে বললো, মনে হলো, কাল বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়। আর রু

বাংলার জল

ছোটবেলায় সন্ধ্যেবেলা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম। খুব মনে পড়ে, বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে একধরনের ডানাওয়ালা পিঁপড়ে আলোর চারপাশে ঘুরতো। গায়ে মাথায় বসে ভীষণ বিরক্ত করতো। আমরা সেগুলোকে বাদলপোকা বলতাম। একদিন সন্ধ্যেবেলা পোকাগুলো খুব বিরক্ত করছিলো বলে আমি ধরে ধরে হ্যারিকেনের মাথা দিয়ে তাদের আগুনে ফেলে দিচ্ছিলাম। তারা ছটফট করে তার মধ্যেই মরে যাচ্ছিলো। কয়েকটা করার পর দেখতে ভীষণ খারাপ লাগছিলো বলে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আর মারিনি। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম দীপিকারও একই প্রবলেম হয়েছে। সে বিরক্ত হয়ে পাশে একবাটি জল রেখে দিয়েছিলো, পোকাগুলো উড়ে উড়ে তাতে পড়ে আর উঠতে পারছিলো না। তারপর যা হয়। এই গল্প চলার মধ্যেই দীপিকা আমাকে বলেছিলো, তুই কি নিষ্ঠুর রে, পোকাগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে মারলি? ছোট বয়েস, তাই উত্তর দিয়েছিলাম, ওঃ আগুনে পুড়িয়ে মারলে নিষ্ঠুর, জলে ডুবিয়ে মারলে নিষ্ঠুর না? এখন মনে হয় কাউকে মারাটা নিষ্ঠুরতার পরিচয় নয়, কিভাবে মারছি সেটাই নিষ্ঠুরতার পরিচয়। তাই জন্যেই আমার মাথায় কাজ করে, রেপিস্টদের ফাঁসি দিয়ে শহীদের মতো মারার চেয়ে, দীর্ঘদিন ধরে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মারা উচ

কবি বন্ধুরা বলে, কবিতায় ডুব দাও

Image
কবি বন্ধুরা বলে, কবিতায় ডুব দাও। ডুব কেন? আমি নিমজ্জিত হয়েই থাকতে চাই। ছেলে বলে, মা বাথরুমের বেসিন আর মেঝেটা ঝকঝক করলে আমার খুব ভালো লাগে। বর বলে, ডায়েট চার্টটা এখনো বানিয়ে দিলে না! বারান্দার রেলিঙে বসা পায়রাটা বলে, আজ একটাও বিস্কুট দাওনি! শাশুড়িমা বলেন, গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, বড়দিন সব চলে গেলো, ঠিক আছে যেদিন ইচ্ছে হয় আসিস। বাবা বলেন, বড্ড দূর! বাড়িটাই বদলে ফ্যালো। মা বলে, তুই লেখাপড়াটা একেবারে ছেড়েই দিলি? কাজের মেয়ে, বৌদি কেকটায় বড্ড মিষ্টি দিয়েছো! কলিগরা বলে, তুমি পি এইচ ডি টা বরং করেই নাও। আঁকার দিদি বলেন, ইস! ঠোঁটটা সেই-ই ভুল হচ্ছে! রোজ রাতে শোওয়ার আগে খাতায় একবার হলেও পেন্সিল দিয়ে আঁচড় কেটো। নাচের ম্যাম? উফ! আবার স্টেপ মিস? ঘরের আয়নাটা বলে, এতো স্নেহপদার্থ নিয়ে তুমি করবেটাই বা কী? বন্ধুরা বলে, তুমি ঘরকুনো হয়েই থেকো। খেয়াল হলো, এইরে যাঃ ওবেলার মাংসটার জন্যে নুন লেবুটা তো মেখে রাখা হয়নি! আমি নিজেকে বলি, তোমার শুধু নিমজ্জন কি মানায়? “তুমি তো তেমন গৌরী নও”।

ভেসে যায়

“মালতী, ছটা ছোটো চামচ আছে কিনা দ্যাখো তো।” মালতী, দিদিকে দেখিয়ে দেখিয়ে গুনতে থাকে, “এক, দুই, তিন…..।” “ছটা নেই দিদি, পাঁচটা আছে।” “সত্যি আমি কি বোকা দ্যাখো, এখন তো আর পুকুর ঘাটে বাসন মাজা নয় যে, মাজতে গিয়ে কিছু চামচ হারিয়ে যাবে। সে একটা সময় ছিলো, এক বোঝা বাসন নিয়ে পুকুরে মাজতে গেলো। তার কিছু না কিছু হারিয়ে এলো। তারপর এই ঘাট খোঁজা, ওই ঘাট খোঁজা। জাল ফেলতে গিয়ে কেউ থালা, বাটি, গেলাস পেলে আবার ফেরৎ দিতে আসতো। তারপর যে বাসনগুলো ভেসে যেতো, সেগুলো নিয়েই থাকতো বেশি ভয়। কোথায় কার ঘাটে গিয়ে থামবে, আদৌ ঘাটে থামবে নাকি মাঝ পুকুরে তলিয়ে যাবে, কে জানে! কারো কারো তো কানের দুল, নাকছাবিও হারিয়ে যেতো। তারপর সারাদিন তন্নতন্ন করে জল ঘোলা করা। কেউ পেতো, কেউ তাই নিয়েই হা হুতাশে কাটাতো।”   এক নিশ্বাসে দিদি এসব কথা বলতে বলতে ফিরে গেলো ছোটবেলায়। মালতী দিদিকে থামিয়ে দিয়ে বললো, “দিদি আমরা তো এখনো পুকুর ঘাটে বাসন মাজি, চান করি, জামাকাপড় কাচি। টাইম কলে জল আসে, ধুর! আমাদের সেসব পোষায় না। ওটাই অভ্যেস গো দিদি।” দিদি মালতীর কথায় সায় দিয়ে বলে, “হ্যাঁ যাদের যা অভ্যেস সেটা বদলা

মকর

“অতো মকরচাল খেয়ে পেট ব্যথা করে কি মরবি? এমনিতে রোগ নেই বললেই তো চলে, আজ পেটে ব্যথা, কাল পায়ে ব্যথা। তার উপর আরো লুকিয়ে লুকিয়ে চালগুলো খা পরে বুঝবি। রাত থেকে তো আবার পিঠের মুখ চলবে।” আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে মকরচাল খেতাম। আর মা অমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সাবধান বাণী শুনিয়ে যেতো। আমরা আমাদের মতো বিচার করতাম কাদের বাড়ি থেকে দেওয়া চালটা ভালো খেতে। ব্রাহ্মণদের জেঠিমারা, বা আমাদের পুরোহিত পুজো করে পাওনা চাল থেকে আমাদের অনেক মকরচাল দিয়ে যেতো। মকরচাল আসলে দুধে ভেজানো আতপচাল। তাতে আর কি মেশাতো জানি না, তবে পুজো করার পর আমরা পেতাম, তাই অনেক গাঁদাফুলের পাপড়ি থাকতো। আজ মকরসংক্রান্তি। এই দিনেরই একটা ঘটনা প্রতিবছর মনে পড়ে। আমি তখন খুব সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়তাম। আমাদের গ্রামের জানাদের বাড়িতে প্রতিবছর এই দিনে মনসা পুজো হয়। আমি সে বছর ওদের বাড়িতে পুজো দেখতে গিয়েছিলাম। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুজো দেখার সময় একটা মেয়ে এসে আমাকে বললো, “আমার মা তোকে একবার ডাকছে আমাদের বাড়ি চল!” আমি প্রথমটায় কেমন ভয় পেয়ে থতমত খেয়েছিলাম, কি জানি কোনো দোষ করিনি তো! ডাকছে কেন? আমার সঙ্গে তো এদের খুব ভাল

শ্যাঁকামালের মেলা

“কি গো ছোটমামী, মেয়েরা মেলায় আসবে তো?” “কি জানি মা, কে কি করে। সবারই তো বাড়িতে কাজ। তোর মেয়েরা আসবে?” “হ্যাঁ, বড়টা আসবে, ছোটটা হয়তো এবার পারবে না। মেজোমামী তোমার মেয়েরা?” মেজোমামীও ওইরকমই একটা উত্তর দেয়। মেলা চলার মাঝামাঝি পর্যন্ত এই চলে। কে এসেছে, কে আসবে। এই গল্পের মামীরা হিন্দু, ভাগ্নি মুসলিম। কিন্তু মেলাটা মিলেমিশে সবার। ছোট থেকে সেই মাঘ মাসের আট তারিখের অপেক্ষায় থাকতাম। দিন গুনতাম, আর কত বাকি। আনে-বালা পল যানে-বালা হ্যায়।কিন্তু সেসব আমাদের মাথায় থাকতো না। আগে তো আসুক, তারপর যাওয়ার কথা। আমাদের গ্রামে ফকির পাড়ায় একটা মসজিদ আছে। সেটার আসল নাম হয়তো শাহ-কামালের মসজিদ। কিন্তু সবাই সেটা শ্যাঁকামালের মন্দির বলে। কেউ মসজিদ বলে না। ওটাকে ঘিরেই মেলা। প্রতি মাঘ মাসের সাত তারিখে ওই মসজিদটাকে পুরো দুধ দিয়ে ধোয়া হয়। বাজি পুড়িয়ে আনন্দ করা হয়। এটাকে বলে মাড়ো ধোওয়া। তারপর আট তারিখ থেকে মেলা শুরু হয়। পীরের গান আর যাত্রাও হয়। আগে টানা আট-নদিন যাত্রা হতো। এখন কদিন হয় জানিনা। মসজিদের মাহাত্ম্য এতোটাই যে, সবাই সুখে-দুখে বাবা শ্যাঁকামালকে মানত করে বসে। জ্বর

চাকরিওলার মৃত্যু

সময় দুটো। ট্রেন দুটো পনেরোয়। স্টেশন প্রায় এক কিলোমিটার। বেরোনোর ঠিক আগে জয়ন্তীদি ঘড়িটা দেখে আমাকে সুন্দর করে গুছিয়ে বুঝিয়ে দিলো, “তুই রাস্তায় বেরিয়ে প্রথমেই দেখে নিবি কাছাকাছি রিক্সা আছে কিনা। যদি থাকে, তাহলে তুই পাঁচ মিনিট নিশ্চিন্তে অটোর জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবি। পেয়ে গেলে তো ভালো, তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবি। না পেলে, রিক্সাটাকে ডেকে নিবি। চিন্তা নেই ট্রেন পেয়ে যাবি।” এতো গোছানো পরামর্শে আমরা অনেকেই হাসাহাসি করলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় বেরিয়ে এক মিনিটের মধ্যে দুটো অটো গেলো। ফাঁকা ছিলো না। রিক্সা দেখার কথা আমি ভুলেই গেছিলাম। হঠাৎ দেখি এক রিক্সাওলা খুব হাসিহাসি মুখ করে খুব দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে আসছে। জয়ন্তীদির দেওয়া পরামর্শ ভুলে জিজ্ঞেস করলাম, স্টেশন যাবেন? -- হ্যাঁ, বুঝতেই পেরেছি। -- কত নেবেন? -- যা হোক দেবেন। -- দশ? -- আপনার যা ইচ্ছা। -- বললাম, দুজনের কুড়ি, একজনের কেউ কেউ নানানরকম ভাড়া বলে। -- ও আপনি যা ইচ্ছা তাই দেবেন। বোঝা গেলো, সে আমাকে তার রিক্সায় চাপাতে পেরেই বর্তে গেছে। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। একটু পরেই রিক্সার স্পিড বাড়তে থাকলো দ