Posts

কড়ুই

Image
শীতের ঠিক আগে আগে মুর্শিদাবাদ থেকে মিস্ত্রী আনা হতো কড়ুই তৈরি করার জন্য। তারা এসে অনেকদিন থাকতো, খেতো, আর কড়ুই বুনতো। এই কাজটা সবাই পারে না। একটা কড়ুই বুনতে অনেকদিন সময় লাগতো। আমি ছোটবেলায় দুটো কড়ুই বোনা দেখেছি। মড়াই বোনাও দেখেছি একবার। মড়াইটা খড় পাকিয়ে বিচালি তৈরি করে বুনতে হতো, আর কড়ুইটা বাঁশের বাতা দিয়ে। মড়াই নিয়মমতো ছোট-বড় করা যেতো। কড়ুই একবার তৈরি হয়ে গেলে ফিক্সড। ষাট মণ, আশি মণ, নানা মাপের কড়ুই হতো।   প্রথমে মাটিতে বাতা পুঁতে পুঁতে গোল করে পানের ডাবরের মতো একটা ফ্রেম বানানো হতো। তারপর তারমধ্যে আরো সরু সরু বাতা দিয়ে দিয়ে সুন্দর ডিজাইন করে কড়ুই বোনা হতো। ঝুরি, চুপড়ি, ধামা বানানোর মতোই একটা পদ্ধতি। কড়ুইয়ের ফ্রেম এতো বড় তাই দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাওয়া যেতো না। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি হলে, দড়ি দিয়ে বেঁধে পাঁচিল টপকে অনেক কষ্ট করে ভিতরে নিয়ে যেতে হতো। অনেক লোকও লাগতো তার জন্যে। এইসব কঠিন কঠিন কাজ করার সময় তারা মুখে নানা আওয়াজ করতো। গান করতো। ছড়ার মতো করেও অনেক লাইন বলতো। সেগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগতো। কিন্তু উচ্চারণ বুঝতে পারতাম না...

মহালয়া

মহালয়ার দিন ভোরবেলা উঠতাম। আগেরদিন থেকেই মনে মনে একটা উত্তেজনা কাজ করতো। এই তো কাল মহালয়া, তারপরেই স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ে যাবে। একমাস ছুটি কি আনন্দ। পরীক্ষার আগে ভোরবেলা উঠে লেপ মুড়ি দিয়ে পড়তে বসেছি দু-একবার। আলাদা করে ভোরের আকাশ কখনো দেখা হতো না, মহালয়ার দিন ছাড়া। আবির ছড়ানো ভোরের আকাশ। হালকা শীত শীত ভাব। টিনের চালে শিশির পড়ার টুপটাপ আওয়াজ। শব্দ বলতে বীরেন্দ্র কৃষ্ণের গলা। একদম ছোটবেলায় বাবা রেডিও চালিয়ে দিয়ে তুলে দিতো। গান আর কথাগুলোর মানে কিছু না বুঝলেও শোনাটা যেন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। শুধু তাই নয় মহালয়াটা এতোটাই পরিচিত যে ঘুম ভাঙার পর বলে দিতে পারতাম সবে শুরু, নাকি আরও অনেক বাকি। ভোরের হালকা আলোয় শুনতে ভালোও লাগতো। পরদিন সকালে চায়ের আসরে - কে কখন উঠেছে, কে পুরোটা শুনেছে, কেউ আদৌ শুনেছে কিনা তাই নিয়ে চলতো বিস্তর আলোচনা। একটু বড় হতে রেডিওরটা শোনা শেষ হলে, চলে যেতাম মেজোমার বাড়ি। টিভিতে মহালয়া দেখার জন্যে। গ্রামে তখন দুটো টিভি। একটা ক্লাবে, আর একটা মেজোমাদের। দুটোই সাদা-কালো। ক্লাব একটু দূরে। তাই মেজোমার বাড়ি। ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে একটা ঝামেলা হওয়ায় তাদের টিভিটা বন্ধও ছিলো বহুদ...

শিক্ষক দিবস

আড়ম্বর করে ফেসবুকের দেওয়ালে কোনো “দিবস” জানানোটা পছন্দ করি না। হাস্যকর লাগে। মনে হয় এ আবার হওয়ার কি আছে - আলাদা করে প্রেম দিবস, মা-বাবা দিবস, বোকা বোকা গোলাপ দিবস, বন্ধু দিবস। কৃত্রিম লাগে। প্রতিটা দিনই সব দিবস হতে পারে। তবে এটা ঠিক যে, কিছু লিখে ফেসবুকের দেওয়ালে শেয়ার করতে চাইলে অনেক ঘটনাই লেখা হয়ে যায়। না হলে অলস মস্তিষ্ক একেবারেই কাজ করতে চায় না। কাল থেকে একটা ঘটনা বারবার মনে পড়ছে। আমি তখন খুবই ছোট। শিক্ষক হওয়ার মতো বয়েস হয়নি। যোগ্যতা নিয়ে এখনো সংশয় আছে। সাল তারিখ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। চাইলেই বের করা যায়। সেদিন আমার বড় জেঠুর এক নাতনির অন্নপ্রাশন ছিলো। ওই দিন দুপুরে আমাদের পাশের বাড়ির পিসেমশাই তালগাছ থেকে পড়ে গেছিলো। সব আনন্দ মাটি হয়ে সবাই ওইদিকেই দৌড়। পিসেমশাই তালগাছে উঠে হাঁড়ি বেঁধে রাখতো। গরমের দুপুরে তালের রস খাওয়ার জন্য। কাজটা তার কাছে খুব সহজ ছিলো, অভ্যেস বলেই। তবু অভ্যেসকে ছাড়িয়ে বিপদটাও ঘটে গেছিলো। বহু চিকিৎসার পর পিসেমশাই লাঠি ধরে টলে টলে হাঁটতে পেরেছিলো। হাঁটতে পারার পর তার অদম্য ইচ্ছা আর মনের জোর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশার আলো দেখিয়েছিলো। দিন আনা দিন খাওয়া জীবনে আ...

সবই মায়া

সকাল নটায় বেরোলাম। ট্রেন নটা ছত্রিশে। আসে চল্লিশে। তড়িঘড়ি বেরোনো। বেরোনোর সময় সাতপাঁচ না ভেবে চট করে, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং একটা চামড়ার স্যান্ডেল টেনে নিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তবুও শাড়ির সঙ্গে কিটোটা বড্ড বেমানান। বরকে বললাম অফিস যাওয়ার সময় আমাকে স্টেশনে নামিয়ে দিতে। তাই হলো। হুশ করে স্টেশন। তারপর নামমাত্র হাঁটা। সামান্য জলও পেরোতে হলো। স্টেশনে আমাকে দেখেই আমার কলিগ চেঁচিয়ে উঠে বললো, “একি? তুই আজকে শাড়ি? মরণদশা এই বৃষ্টিতে, পারিসও বটে তুই। ও তোর তো আবার বৃষ্টিই ভালো লাগে।”  সহযাত্রীরাও অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো। “হ্যাঁ গো, আমার তো বৃষ্টি খুব পছন্দ” বলেই, হেসে হেসে তার দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে কেমন একটা ফিলিং হতে থাকলো। খুব চেনা ফিলিং। আস্তে আস্তে পা টেনে তার কাছে এগিয়ে যাওয়ার সময় বোঝার চেষ্টা করলাম, কি হয়েছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। আক্ষরিক অর্থে পায়ের তলার মাটি গেলো সরে। বুঝলাম জুতো থেকে জুতোর সোল আলাদা হতে চাইছে। হাঁটতে গেলেই দেখি ডগার দিকটা আলাদা হয়ে ঝুলছে।  জলে পা ভেজাতে চটি অমন আহ্লাদে হয়ে গেলো, নাকি অনেকদিন ওটা পরিনি বলে, কিছু বুঝলাম না। আহ্লাদে চটি ন...

মহিলা কামরা ৮ : অন্য এক পথে

সকাল আটটা দশ। এ এক অন্য মহিলা কামরা। উঠেই দেখি কামরার একটা দিক পুরো ফাঁকা। ভাবলাম এই দিকের কামরা বুঝি এমনই হয়, তায় আবার এতো সকাল। গুছিয়ে জানলার ধারে বসলাম। একটা স্টেশন এলো। হুড়মুড় করে সবাই উঠেই ফাঁকা দিকে ধেয়ে এলো। অন্যদিক থেকে অন্যরা চিৎকার করে সাবধান করতে লাগলো, “ওদিকে নোংরা, যেও না যেও না।” আমার টনক নড়লো। চারদিক চনমন করে তাকিয়ে নোংরা খুঁজতে লাগলাম। ট্রেনের মেঝেতে খাবারের প্যাকেট, ঘুগনির বাটি, লেবুর খোসা এসব ছাড়া আশেপাশে কিচ্ছু দেখতে পেলাম না। এ আর কি এমন নোংরা, আমাদের এখানে ট্রেন তো এমনই হয়। স্বচ্ছ ভারত করতে হবে, স্বচ্ছ ট্রেন তো নয়! তবুও মনে হলো, আমি বুঝি নোংরাটা দেখতে পাচ্ছি না। উঠে অন্যদিকে চলেই যাই। গিয়ে দেখলাম ততক্ষণে আর কোনো সিট ফাঁকা নেই। অনেকদূর যাওয়া, তাই ফিরে এসে আগের জায়গাতেই বসলাম। প্রতিটা স্টেশন আসে, লোকজন ফাঁকা দিকে ধেয়ে আসে, সবাই সাবধান করতে থাকায় আবার ফিরে গিয়ে ওই দিকেই ভিড় করে। আমি একা অমন সাহস করে বসে থাকায় লোকে আমাকে হয়তো পাগলই ভাবছিলো। কিচ্ছুক্ষণ পর কেউ আর অন্যদের পাত্তা না দিয়ে আমাকে দেখে ভরসা পেয়ে বসতে এলো। আমার সিট, আমার উল্টোদিকের সিট...

মহিলা কামরা ৭

মুকুটের পালক রাজকুমারদা পেয়ারা নিয়ে এসে চুপ থাকতে পারে না। সব দিদিমণিদের মনে করিয়ে দেয় সে হাজির। এক দিদিমণিকে বারবার জিজ্ঞেস করতে থাকলো, দিদিমণি আজ পেয়ারা দেবো না? দিদিমণি বাধ্য হয়ে তাঁর প্রবলেম বলতে শুরু করলেন, “আরে নিতেই তো পারি। মুশকিল কি জানো, আমি খেতে ভুলে যাই। ব্যাগে পড়ে থেকে পেকেপুকে একাকার হয়ে যায়, যখন ব্যাগ থেকে পেয়ারা বেরোয় তখন দেখি পচা গন্ধ হয়ে গেছে। এক যদি টিফিন খাওয়ার পরে পরেই খাই তাহলে হয়, যদি পরে খাবো বলে রেখে দি তাহলেই গ্যালো। ঠিক আছে তাও দাও ডাঁসা দেখে একটা।” রাজকুমার ডাঁসা দেখে একটা দিয়ে দিলো। দিদিমণির পাশে আর এক দিদিমণি বসে ছিলেন। উনি বলতে লাগলেন, “তুমি ডাঁসা পছন্দ করো? আমার মেয়েও তাই।” -- “আমার মেয়েরা আবার ডাঁসা একদম পছন্দ করে না, একটু পাকা পাকা হলে তাদের খুব ভালো। বড় মেয়ে তো আবার মাঝখান থেকে বীজগুলো খেয়ে খোলাটা ফেলে রাখে।” -- “আমার মেয়ের বাব্বা! একচুল এদিক ওদিক হওয়া চলবে না। না পাকা, না খুব কাঁচা। ওই একেবারে ডাঁসা যাকে বলে সেটাই চাই।” -- “তোমার মেয়ে এখন কি করে যেন?” -- “সে তো মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেছে।” -- “ও তাই? সেটা জানতাম না তো!” -- “হ্যাঁ,...

জীবনের ওঠাপড়া

মঙ্গলবার দুপুর। সময় দুটো পঞ্চাশ।  আমি আর আমার এক কলিগ গল্পে মত্ত ছিলাম। তখন আর এক কলিগ হুড়মুড় করে কাঁধে ব্যাগ নিতে নিতে বললো, “কি গো তোমরা বাড়ি যাবে না?” আমি বললাম, হ্যাঁ আমি যাবো, তুই একটু দাঁড়া। সে বললো, “না, তোমার এখনো সই- ফই কিছুই হয়নি, আমি দাঁড়াবো না। এখনই দৌড়ে দৌড়ে যেতে হবে, নাহলে ট্রেন মিস হয়ে যাবে।”   ট্রেন তিনটে নয়ে, আসে আর একটু দেরিতে। স্টেশন যেতে রিক্সায় লাগে সাত মিনিট মতো। আমি কথায় কথায় সময়টা বুঝতে পারিনি। যার সঙ্গে গল্প করছিলাম, ভাবছিলাম সেও ওই ট্রেন ধরবে, তাই আমি তার উপর ভরসা করেছিলাম। জানা গেলো সে পরের ট্রেন ধরবে। সেই কলিগ চলে গেলো। আর এক দিদিও বেরোচ্ছিলো। বললো, “তুই তাড়াতাড়ি সই করে চলে আয় পেয়ে যাবি, আমি বেরোলাম।” বলে সেও চলে  গেলো। আমি সব গুছিয়ে তড়িঘড়ি  রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে অটো, রিক্সা কিছুই পেলাম না। কিছুক্ষণ পর এক রিক্সাওলা এলো। -- বললাম, যাবে? -- কোথায়? -- স্টেশন। কোনো উত্তর দিলো না। জানতে চাইলাম কত নেবে? -- কুড়ি টাকা দেবেন। -- কুড়ি কেন? একা গেলে পনেরো তো? -- না, কুড়ি দিতে হবে। তুমি জানো না, রি...